বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার ভাঙন ও অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে তদন্ত

শঙ্কার মুখে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ভবিষ্যৎ?

গত আগস্টে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সামনে উপস্থাপন করা হয় ৩৭ পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদন।

গত আগস্টে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সামনে উপস্থাপন করা হয় ৩৭ পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদন। কয়েক মাস ধরে চলমান এ তদন্তের কেন্দ্রে ছিলেন সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়াব। আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখা ব্যক্তিটির নাম থাকায় স্বভাবতই প্রতিবেদনটির দিকে সবার নজর ছিল। একই সঙ্গে ডব্লিউইএফের ভবিষ্যৎ নিয়েও জেগে ‍ওঠে আশঙ্কা। কারণ এমন এক সময় চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি আসে যখন প্রচলিত বিশ্বায়ন ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে। ভাঙনের কবলে ডব্লিউইএফের প্রতিনিধিত্বশীল বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা। খবর এফটি।

সুইস আইনি সংস্থা হোমবার্গারের ওই তদন্তের উদ্দেশ্য ছিল ৮৭ বছর বয়সী ক্লাউস শোয়াব ও তার স্ত্রী হিল্ডে শোয়াবের কর্মকাণ্ড তলিয়ে দেখা। ফোরামটিকে তারা ব্যক্তিগত ক্ষমতা কেন্দ্র ও অর্থোপার্জনের যন্ত্রে পরিণত করেছেন কিনা তা ছিল প্রশ্ন। তদন্তকারীরা এক লাখের বেশি ই-মেইল ও ৬৫ হাজার অতিরিক্ত নথি যাচাই করেন। সঙ্গে ছিল বর্তমান ও সাবেক কর্মী মিলিয়ে ৮৬টি সাক্ষাৎকার পর্যালোচনা।

তদন্তে কোনো অপরাধ প্রমাণিত না হলেও কিছু অনিয়ম ধরা পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে যথাযথ ব্যাখ্যা ছাড়া খরচ, ব্যক্তিগত ও পেশাগত ব্যয়ের সীমারেখায় অস্পষ্টতা, অপ্রাসঙ্গিক ই-মেইল ও কর্মী ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি। এগুলো আইনগত অপরাধ না হলেও অনিয়ম যে হয়েছে, তা মানতে অসুবিধা হয় না ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের ।

একই সপ্তাহে বোর্ডের একটি উত্তেজনাপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দে, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরক প্রধান ল্যারি ফিঙ্ক ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। সেখানে উপস্থিত কিছু সদস্যের মতে, প্রতিবেদনে একটি গভীর সমস্যা উঠে এসেছে। একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অস্পষ্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মাধ্যমে ক্লাউস শোয়াব দীর্ঘদিন ধরে ফোরামকে পরিবারিক ব্যবসার মতো পরিচালনা করেছেন।

১৫ আগস্ট জেনেভাভিত্তিক ডব্লিউইএফ জানায়, ব্যক্তিগত অবদান ও ফোরামের কার্যক্রমের সীমারেখা অস্পষ্ট হওয়ায় ছোটখাটো অনিয়ম ঘটেছে। এরপর ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক ও রোশের ভাইস চেয়ার আন্দ্রে হফম্যানকে অন্তর্বর্তীকালীন কো-চেয়ার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ফোরাম থেকে পদত্যাগ করা শোয়াব অনারারি চেয়ার হওয়ার সুযোগও পাননি।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ফোরামের পরবর্তী অধ্যায় হবে ক্লাউস শোয়াবের মূল মিশন এগিয়ে নেয়া। অর্থাৎ সরকার, ব্যবসা ও সামাজিক সমাজকে একত্র করে বিদ্যমান বিশ্ব ব্যবস্থাকে উন্নত করা।

আলপাইন রিসোর্ট দাভোসে আয়োজিত ডব্লিউইএফের বার্ষিক সম্মেলন বরাবরই রাষ্ট্রপ্রধান, প্রযুক্তিবিশারদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের টানত। সুইস কূটনীতির মাধ্যমে এটি একটি নিরপেক্ষ মঞ্চ হয়ে উঠেছিল, যেখানে পুঁজিবাদ নিজেকে মূল্যায়ন করত। সম্পাদন হতো বিভিন্ন ধরনের চুক্তি। এখন বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক দশক ধরে ডব্লিউইএফ গুরুত্বপূর্ণ মিশন পরিচালনা করে এলেও ক্লাউস শোয়াবের পদত্যাগের ফলে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রকাশ্যে এল। একই সঙ্গে মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে দাভোসের যুগও এখন বদলেছে। বহুপক্ষীয় বাণিজ্য সংকুচিত হচ্ছে, দেশ বা অঞ্চলভিত্তিক সুরক্ষাবাদ বাড়ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বড় শক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক শাসন কাঠামোকে পুনর্গঠন করছে। বিশ্বায়নের অতিপ্রচলিত সংজ্ঞা যত দ্রুতই প্রশ্নের মুখে পড়বে, ততটাই পিছিয়ে পড়তে পারে দাভোসের লক্ষ্য। এছাড়া প্রতিযোগীরা নতুন প্লাটফর্ম তৈরি করছে, যেমন রিয়াদ ও বেইজিংয়ে বাণিজ্য সম্মেলন। সব মিলিয়ে ডব্লিউইএফের অস্তিত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

ক্লাউস শোয়াবের সঙ্গে একাধিক বই লিখেছেন থিয়েরি মালারেট, তার পরবর্তী বইয়ের শিরোনাম ‘ডেথ অব দাভোস’। থিয়েরি মালারেট বলেন, ‘দাভোস সবসময়ই বিশ্বে ঘটে যাওয়া বড় পরিবর্তনগুলোর প্রতিচ্ছবি ছিল। পশ্চিমাদের আত্মমগ্ন ক্ষমতার কারণে এর অতীত ছিল গৌরবের, এখন সে যুগ শেষ। বহু-মেরুতাই এখন বিশ্বের ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে আপনি চীনে, রিয়াদে, অ্যাসপেনে অনুষ্ঠান দেখবেন আর ইউরোপীয় দাভোস ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে।’

দাভোস ২০২৬-এর আয়োজন ফোরামের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বোর্ডের একাংশ মনে করে, ডব্লিউইএফের টিকে থাকা নির্ভর করছে পুনর্গঠন ও নতুন নেতৃত্বের ওপর। তবে অনেকের সন্দেহ রয়েছে, বর্তমান বোর্ড চলমান বিশ্বের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বড় ধরনের সংস্কার আনতে পারবে কিনা।

কারো কারো মতে, ক্লাউস শোয়াবের উত্তরাধিকার ও ফোরামের সুনামের এক দীর্ঘ ও ধীরে ধীরে ক্ষয় প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপ হোমবার্গারের রিপোর্টটি। যেখানে শুধু প্রতিষ্ঠাতা নয়, প্রভাবশালী অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ার পিটার ব্রাবেক-লেটমাথে ও শোয়াবের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে ফোরামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, বিভিন্ন পক্ষের সংলাপে প্লাটফর্ম তৈরি হলো ডব্লিউইএফের মূল কাজ। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, যেখানে বিশ্বই এখন এলিটদের ঐক্যে বিশ্বাস রাখে না, সেখানে ফোরাম কি পুনর্গঠিত হয়ে প্রাসঙ্গিক থাকতে পারবে।

‘সুইস মেড: দ্য আনটোল্ড স্টোরি বিহাইন্ড সুইজারল্যান্ডস সাকসেস’ বইয়ের লেখক জেমস ব্রেইডিং বলেন, ‘১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে ডব্লিউইএফ। সংস্থাটি একাধিক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে, বৈশ্বিকায়নের পশ্চাৎপদ, এলিটদের প্রতি ব্যাপক অবিশ্বাস ও ক্লাউস শোয়াবের নেতৃত্ব থেকে হঠাৎ পরিবর্তন। পরবর্তী সভাটি শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি সংস্থার টিকে যাওয়ার বা হারানোর পরীক্ষা হতে পারে।’

আরও